English   Italiano

পুণ্য জীবনের এমন এক মানুষ ছিলেন
যাঁর নাম ধন্য বেনেডিক্ট;
তিনি ঈশ্বরের অনুগ্রহেও ধন্য ছিলেন।

(মহাপ্রাণ গ্রেগরি-লিখিত ‘সংলাপ’)


সাধু বেনেডিক্ট: বেয়াতো আঞ্জেলিকোর অঙ্কিত ছবির অংশবিশেষ।
৫ম শতাব্দীর অন্যান্য সাধু সন্ন্যাসীর বৈসাদৃশ্যে, সাধু বেনেডিক্ট সম্পর্কে তাঁর সমসাময়িক লেখকেরা কিছুই বলেন না। তাঁর সম্পর্কে কিছু তথ্য জানার জন্য আমাদের নির্ভর করতে হবে একটিমাত্র লেখার উপরে তথা, মহাপ্রাণ সাধু গ্রেগরির লিখিত “সংলাপ”, চার খণ্ড-বিশিষ্ট একটি বই যা ৫৯৩-৫৯৪ সালে লেখা, এবং যার দ্বিতীয় খণ্ডটি সম্পূর্ণই সাধু বেনেডিক্টের জীবনী সংক্রান্ত।
সাধু গ্রেগরি সাধু বেনেডিক্টের নবীয় গুণ ও তাঁর আশ্চর্য কাজ সাধন করার ক্ষমতা তুলে ধরেন, যেহেতু বাইবেল অনুসারে এগুলিই একটি মানুষকে ঈশ্বরের মানুষ বলে চিহ্নিত করে। অন্য কথায়, সাধু বেনেডিক্টের জীবনীতে ঘটনা ও কাল তত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়; যা গুরুত্বপূর্ণ তা হল সাধু বেনেডিক্টের জীবনীর মধ্য দিয়ে পাঠকের কাছে জীবন-পথের সেই আবশ্যক নানা পদক্ষেপ তুলে ধরা যেগুলো বেয়ে মানুষ ঈশ্বরের দিকে এগোতে পারে।
সুতরাং সাধু বেনেডিক্টের জীবনীর ঘটনাগুলোতে প্রতীকমূলক উদ্দেশ্য নিহিত, উদাহরণস্বরূপ: ফলপ্রসূতা এমন কিছু থেকে আসে যা আপাতদৃষ্টিতে অনুর্বর মনে হয়; আরও, জীবন মৃত্যু থেকে আসে; এবং, যে মানুষ পবিত্রতা অর্জনের সাধনা করে, সে মাসবজাতির মঙ্গলের জন্য ঈশ্বরের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, ইত্যাদি।
আর যেহেতু সাধু বেনেডিক্টের সাধিত আশ্চর্য কাজসকল ছিল তাঁর প্রার্থনার ফল, সেজন্য তাঁর জীবনে প্রার্থনার গুরুত্ব কম মূল্যবান বলে বিবেচনা করা যাবে না। আর আসলে প্রার্থনা ছিল তাঁর জীবনের প্রধান দিক, এমনকি তিনি প্রত্যাশা করছিলেন, তাঁর অনুসারী সন্ন্যাসীদের জীবনেও প্রার্থনাই সর্বোপির প্রাধান্য পাবে। এপরিপ্রেক্ষিতে তাঁর নিয়মে স্পষ্টভাবে লেখা আছে যে, “ঐশকাজের আগে কোন কিছুকেই প্রাধান্য দিতে নেই”, অর্থাৎ সঙ্ঘের সমবেত প্রার্থনাই প্রাধান্য পাবে।
একথা বলার পর, সাধুজীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সঙ্ক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করা হল।

রোম নগরীর উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলে নুর্সিয়া শহরে ৪৮০ খ্রীষ্টাব্দে সাধু বেনেডিক্ট জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁকে উচ্চশিক্ষার জন্য রোমে পাঠানো হয়েছিল এবং সেখানে তাঁর মনের পরিবর্তন ঘটল যা তাঁকে এ পার্থিব জগৎ ত্যাগ করতে উদ্দীপিত করল ও নতুন মানুষে রূপান্তরিত করল। কথিত আছে, সর্বপ্রথমে তিনি কিছু সংখ্যক তপস্বীর সঙ্গে রোম থেকে পুব দিকে আফিলেতে দিন কাটান, পরে সুবিয়াকোতে নির্জন অবস্থায়ে তিন বছর একাকী কাটান। সেসময়ে তাঁর বয়স ১৫ বা ১৬ বছর।


সাধু বেনেডিক্ট সর্বপ্রথমে সুবিয়াকোর যে গুহায় একাকী বাস করেন,
সেই একই খাড়া পাহাড়ের গায়ে পরবর্তীকালে একটি আশ্রম নির্মিত হয়।

একসময় একদল সন্ন্যাসী সাধুজীকে তাদের পরিচালক হওয়ার জন্য অনুরোধ জানালেন, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি যখন দেখলেন যে তাঁরা খাঁটি খ্রীষ্টীয় আদর্শ অনুসারে জীবনযাপন করতে অসম্মত, তখন তিনি সেখান থেকে সুবিয়াকোতে ফিরে এলে বহুসংখ্যক শিষ্য তাঁর সঙ্গে যোগ দিল এবং তিনি সেখানে বারোটি আশ্রম নির্মাণ করলেন। সেগুলোর এক একটিতে ১২জন করে সন্ন্যাসী বাস করতেন।
কয়েক বছর পর সাধু বেনেডিক্ট কয়েকজন সন্ন্যাসীকে নিয়ে সে অঞ্চল ত্যাগ করে মন্তেকাসিনো নামক জায়গায়, পর্বতচূড়ায়, নতুন একটি আশ্রম নির্মাণ করলেন। মন্তেকাসিনো রোম থেকে ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত।


মন্তেকাসিনো মঠ

মন্তেকাসিনোতে তিনি দিব্যগুণসম্পন্ন সাধু ব্যক্তি হিসাবে পরিচিতি লাভ করলেন, এবং ৬ষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এ মর্ত ত্যাগ করে স্বর্গে গেলেন।


তাঁর শিষ্যদের উপর শরীর ভর দিয়ে সাধু বেনেডিক্ট দু’হাত স্বর্গের দিকে উচ্চ করে প্রার্থনা করতে করতে প্রাণত্যাগ করলেন।


সাধু বেনেডিক্ট সন্ন্যাসীদের জন্য একটি নিয়ম লিখেছিলেন যা সাধু গ্রেগরি-লিখিত তাঁর জীবনীতে “বিচারবোধসম্পন্নতার জন্য উৎকৃষ্ট” বলে বর্ণিত। আর আসলে নিয়মটি পড়ার মাধ্যমে একজন সাধু বেনেডিক্টের মন সূক্ষ্মভাবে উপলব্ধি করতে পারে। সেই নিয়মে সাধু বেনেডিক্ট এমন মানুষ বলে ভেসে ওঠেন যিনি কেবল অসাধারণ ব্যবস্থাপক নন, বরং তার চেয়ে ব্যক্তিবিশেষের প্রতি মনোযোগ ও সম্মান দানের জন্য সন্ন্যাসীদের সহানুভুতিশীল পিতা বলে পরিচয় দেন।
এটি সর্বজন স্বীকৃত কথা যে, মধ্যযুগে ইউরোপ মহাদেশে সন্ন্যাসীদের দ্বারাই খ্রীষ্টধর্ম বিস্তার লাভ করেছিল। এ এমন প্রক্রিয়া যা ইউরোপের নব মানব-চেতনার মধ্যে নিয়মের বেশ কয়েরটা মূল্যবোধ প্রবেশ করিয়েছিল। যেমন, হাতের কাজ আর এমনভাবে গণ্য না করে যে সেটা কেবল অশিক্ষিত দাসের উপযুক্ত কাজ বরং তা মানব মর্যাদাকর এমনকি পবিত্রতাদানকারী কাজ হিসাবে গণ্য করা। এছাড়াও, প্রার্থনা ও কাজের মধ্যে কখনো দ্বন্দ্ব দেখতে নেই: প্রার্থনার সময়ে যেমন মন দিয়ে করা প্রার্থনাই সেই প্রার্থনা ও সে সময়টা পবিত্র করে, কাজের সময়ে তেমনি মন দিয়ে করা কাজই সেই কাজটা ও সেই সময়টা পবিত্র করে। আর কাজকে কম-বেশি পবিত্র ধরনের বা উঁচু-নিম্ন ধরনের কাজ বলে নির্ণয় করা চলবে না, যেহেতু পরিশ্রম সবসময়ই পবিত্র, ইত্যাদি। তাছাড়া, বিখ্যাত ইতিহাস-গবেষক গোল্টজেনের ধারণা যে, গোটা পাশ্চাত্য খ্রীষ্টীয় ঐতিহ্য যে যে স্তম্ভগুলোর উপর ভর করে আছে সেগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল বাইবেল ও সাধু বেনেডিক্টের নিয়ম। ইউরোপের ঐতিহ্য গঠনে ঠিক তেমন গভীর অবদানের জন্যই সাধু বেনেডিক্ট ইউরোপ মহাদেশের স্বর্গীয় প্রতিপালক বলে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।

সাধু বেনেডিক্টের নিয়ম ও জীবনী খ্রীষ্টমণ্ডলীর পিতৃগণ-এ ডাউনলোড করা যেতে পারে।


আমাদের জীবন পাতায় ফিরে যান